মোহাম্মদ মাসুদ
চট্টগ্রামে কর্মময় উজ্জ্বল স্মৃতিচারণে বিদায়ী পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সানতুর ৩২৮ দিনের অবদান জেলার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের গভীরে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তাঁর দায়িত্বপালন এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সফল সমাপ্তি।
বদলিজনিত কারণে চট্টগ্রাম জেলা থেকে বিদায় নিয়েছেন জেলার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার সম্মানিত অভিভাবক, পুলিশ সুপার জনাব মোঃ সাইফুল ইসলাম সানতু, বিপিএম-বার।
২৯ নভেম্বর (শনিবার) জেলা পুলিশ সুপার ফেসবুক ভেরিফাইড পেইজে কর্মময় উজ্জ্বল স্মৃতিচারণে বিদায়ী অনুষ্ঠানে বিদায় অতিথির কর্মময় পথ চলার পেশাদারিত্ব উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের ধারাবাহিক বর্ণনায় প্রিয় সহকর্মীর কর্মস্থলের কর্মকর্তারা স্মৃতিচারণে বলেন, চট্টগ্রামে তাঁর ৩২৮ দিনের কর্মময় পথচলা ছিল- সততা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা, দূরদর্শীতা ও পেশাদারিত্বের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ লাইন্স সিভিক সেন্টারে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের আয়োজনে পুলিশ সুপার জনাব মোঃ সাইফুল ইসলাম সানতু, বিপিএম-বার মহোদয়ের বদলিজনিত বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পুলিশের সকল পদমর্যাদার সদস্যদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, আবেগ ও স্মৃতিচারণে প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিফলিত হয়েছে তার সততা, শৃঙ্খলাবদ্ধতা, কঠোর সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা, মানবিকতা, দূরদর্শী নেতৃত্ব, সহকর্মীদের প্রতি ভালোবাসা ও পেশাদারিত্বের অনবদ্য কর্মগাথা।
চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি চট্টগ্রাম জেলায় নিরাপত্তা ও সেবা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রামে নিরাপত্তা, সেবা ও মানবিকতার সুসমন্বিত এক অধ্যায় সূচনা করেন।
গভীর রাত পর্যন্ত নিরাপত্তা মহড়া পরিচালনা:
মহাসড়কে ডাকাতি প্রতিরোধ, শহর ও গ্রামের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধীদের প্রতি আতংক ছড়িয়ে দিতে তিনি নিয়মিত মহড়া পরিচালনা করেন। রাতভর রাস্তায় তার উপস্থিতি পুলিশ সদস্যদের মনোবল বাড়িয়েছে এবং নাগরিকদের আস্থাকে আরও দৃঢ় করেছে।
অবৈধ অস্ত্র-গুলি উদ্ধার অভিযান:
গোপন তথ্যভিত্তিক অভিযানে বিপুল পরিমানে দেশীয়–বিদেশী অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে সন্ত্রাসী চক্রকে দমন করেন। এতে জেলার সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হয়।
মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান:
মাদক চক্র শনাক্তকরণ, গ্রেফতার এবং বিশেষ টার্গেটেড ড্রাইভের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়েছে।
চাঞ্চল্যকর মামলা উদ্ঘাটন:
দ্রুত তদন্ত, গোয়েন্দা সমন্বয়, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও অপারেশনাল দক্ষতার মাধ্যমে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার রহস্য সফলভাবে উদ্ঘাটন ঘটে।
ওয়ারেন্ট তামিল ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দৃঢ়তা:
দীর্ঘমেয়াদি অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করেন। ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামিদের গ্রেফতার কার্যত নতুন গতি পায়।
ফোর্স কল্যাণে পিতৃতুল্য দায়িত্ব:
পুলিশ সদস্যদের বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং ফোর্স সেফটি সব ক্ষেত্রেই তিনি প্রমাণ করেছেন একজন প্রকৃত অভিভাবকের দায়িত্ববোধ।
আকস্মিক ইউনিট পরিদর্শন ও তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান:
অপ্রত্যাশিত সময়ে বিভিন্ন থানা, তদন্তকেন্দ্র, ফাঁড়ি ও ক্যাম্পে গিয়ে তিনি ফোর্সের চাহিদা, সমস্যা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো দেখে তাৎক্ষণিক সমাধানের ব্যবস্থা করেন।
কল্যাণ সভা ও সম্মাননা প্রদান:
মাসিক সভায় তিনি বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের চাহিবা মাত্র প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রদান করেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে মাঠপর্যায়ে বিশেষ অবদানকারী সদস্যদের তাৎক্ষণিক পুরস্কৃত করেন।
ন্যায়বিচার ও জনআস্থা প্রতিষ্ঠা:
ছদ্মবেশে সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনা, রাতভর মাঠে থাকা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এসবই তাকে মানুষের কাছে মানবিক পুলিশ সুপার হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রো-অ্যাকটিভ ভূমিকা:
জেলা পুলিশের কার্যক্রম, অপরাধবিরোধী বার্তা, ট্রাফিক নির্দেশনা, জনসচেতনতামূলক পোস্টের মাধ্যমে নাগরিকদের সঙ্গে স্থাপন করেছেন আধুনিক তথ্য-সেতু।
ফোর্সের মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগ:
তিনি পুলিশ সদস্যদের মনোবল ও শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিয়মিত আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ, ড্রিল, শরীরচর্চা এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করেন। প্রতিটি ফোর্স যেন আধুনিক দক্ষতায় সমৃদ্ধ হতে পারে— সেই লক্ষ্যেই তিনি দক্ষতা উন্নয়নমূলক বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন।
ফোর্সের বিনোদন ও মানসিক প্রশান্তিতে বিশেষ মনোযোগ:
দৈনন্দিন দায়িত্বের বাইরে পুলিশ সদস্যদের মানসিক প্রশান্তি ও বিনোদনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তিনি খেলাধুলা আয়োজন করেন, যা চট্টগ্রাম জেলা পুলিশে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি:
পুলিশ লাইন্স মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্নতা, শান্ত পরিবেশ এবং ধর্মীয় অনুশীলনের সুযোগ বাড়াতে তিনি বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার প্রচেষ্টায় পুলিশ সদস্যদের জন্য আরও মর্যাদাপূর্ণ, প্রশান্ত ও সংগঠিত উপাসনাস্থল তৈরি হয়।
সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও অপরাধচক্র দমনে দৃঢ় অবস্থান:
জেলার আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল রাখতে তিনি সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যু, ও চিহ্নিত অপরাধীচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। জেলায় অপরাধপ্রবন এলাকায় শান্তি–শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তিনি বিশেষ পুলিশি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন— যেগুলো জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত ভূমিকা রাখে।
একজন নির্লোভ, জনবান্ধব ও সহমর্মী পুলিশ কর্মকর্তা
তার প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়েছে সততা, নির্লোভতা, শৃঙ্খলাবোধ ও মানবিকতার অনন্য সমন্বয়। তিনি কঠোর দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু সহকর্মীদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত সহমর্মী, সহানুভূতিশীল ও প্রেরণাদায়ী।
তিনি চট্টগ্রাম জেলার সকল পুলিশ সদস্য, সহকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী এবং সাধারণ মানুষের প্রতি বিনম্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন—“চট্টগ্রামের মানুষের ভালোবাসা আমার কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।”
তার অবদান চট্টগ্রাম জেলার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের গভীরে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি রেখে গেলেন দায়িত্ব, মানবিকতা ও পেশাদারিত্বের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।